২৫, জানুয়ারী, ২০২০, শনিবার

২শ’ বছর আগের জ্বীনের মসজিদের আদ্যোপান্ত ইতিহাস !

ঐতিহাসিক মসজিদ-ই-জামে আবদুল্লাহ লক্ষীপুর জেলার রায়পুর পৌর শহর থেকে ৮/৯ শ’ গজ পূর্বে পীর ফয়েজ উল্লাহ সড়কের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। প্রাচীন এই মসজিদটি লোকমুখে জ্বীনের মসজিদ নামে পরিচিত।

আনুমানিক অষ্টাদশ শতকের শেষার্ধে নির্মিত হয়েছে এটি। প্রায় ২শ’ বছর আগের মেঘনা ও খরস্রোতা ডাকাতিয়া নদীর মোহনাস্থল লক্ষ্মীপুর। রায়পুর উপজেলার এ অঞ্চলটা ছিল তখন জনশূন্য বিস্তৃত চরাঞ্চল। এখানে নির্মিত হচ্ছিল নয়নাভিরাম এ মসজিদটি।

বিভিন্ন কাজে দিনের বেলা এই এলাকা দিয়ে দূর-দূরান্তে যাতায়াতকারী লোকজন দেখতে পেতেন, কেউ কাজ না করলেও প্রতিদিনই বাড়ছে মসজিদটির আকার। প্রতিদিনই সকালবেলা দেখা যেত নির্মাণ কাজ আগের দিনের চেয়ে অনেকখানি এগিয়েছে। ফলে তাদের বিশ্বাস জন্মে- একদল জ্বীন হয়তো রাতের বেলা লোকচক্ষুর অন্তরালে তৈরি করছে মসজিদটি।

কথিত আছে, মৌলভী আবদুল্লাহর কতিপয় জ্বীন শিষ্য রাতে মসজিদটির গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো সম্পন্ন করতো। মসজিদের তলদেশে স্থাপিত পুকুরগুলোতে জ্বীনেরা গোসল করত। এলাকাবাসী জেনে আসছেন স্বল্প সময়ে গঠিত এ মসজিদটির নির্মাণ কাজে জ্বীনেরা সার্বিক সহযোগিতা করে এবং তারা এখানে নিয়মিত এবাদত করতো।

তাই এই ঐতিহাসিক মসজিদটি জ্বীনের মসজিদ নামেই পরিচিত। আবার কেউ কেউ বলেন, অতি স্বল্প সময়ে একটি বিশেষ ডিজাইনের এ মসজিদটি নির্মাণের ফলে এটিকে জ্বীনের মসজিদ বলা হয়। সেই থেকে মসজিদটি জ্বীনের মসজিদ হিসেবে পরিচিত।

এখনো এ অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের বিশ্বাস এমনই। Share মসজিদ ই জামে আব্দুল্লাহ এর একাংশ। সোর্স: চ্যানেল আই তবে প্রকৃত ঘটনা ভিন্ন। মসজিদটির সামনে সিঁড়ির কাছে লাগানো শিলালিপিতে একে ‘মসজিদ-ই-জামে আবদুল্লাহ’ বলা হয়েছে। সে সময়ে এখানে আগমন ঘটে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মহান ধর্ম সাধকদের।

তখন রায়পুরে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন মৌলভী আবদুল্লাহ। সময়টি ছিল বাংলা ১২৩৫ সাল। জন্মের পর শিশু আবদুল্লাহর মধ্যে ব্যতিক্রমী জীবন লক্ষ্য করা যায়। যখন সে কথা বলা শেখে, তখন থেকেই তার মধ্যে আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ পায়।

কৈশোরে ধর্মীয় শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহ ভারতের দেওবন্দ নামক স্থানে মাদরাসায় দারুল উলুমে ভর্তি হন। সেখানে দীর্ঘ ১৭ বছর ওলামায়ে কেরাম-এর সান্নিধ্যে থেকে উচ্চতর জ্ঞান ও দ্বীনি শিক্ষা লাভ করেন। মৌলভী আবদুল্লাহ জ্ঞান আহরণ শেষে দেশে ফেরার পথে দিল্লীতে কিছুদিন অবস্থান করেন।

এ সময় দিল্লী শাহী জামে মসজিদের শৈল্পিক অবয়ব তাকে আকৃষ্ট করে। দেশে ফিরে অনুরূপ একটি মসজিদ তৈরি করার স্বপ্ন দেখেন তিনি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার প্রবল আত্মবিশ্বাস ও ইচ্ছা শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহর পবিত্র মসজিদ নির্মাণে অগ্রসর হন।

দিল্লীর শাহী জামে মসজিদের হুবহু নমুনার ১০৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৭০ ফুট প্রস্থ নিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করেন। পূর্ববঙ্গের এই প্রখ্যাত মসজিদটি মাটি থেকে দশ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এ জামে মসজিদটি লোকে এক নামে চেনে।

জ্বীনের মসজিদের তিন গম্বুজ। সোর্স: নোয়াখালি নিউজ এ বুজুর্গের সহচরদের অধিকাংশই ছিল গরীব শ্রেণির। দিনের বেলা তারা নিজেদের জীবিকা অর্জনে কাজ করতেন আর রাতের বেলা মাওলানা আবদুল্লাহর নির্দেশনায় স্বেচ্ছায় করতেন মসজিদ নির্মাণের কাজ।

ফলে এ অঞ্চল দিয়ে দিনেরবেলা যাতায়াতকারীরা দেখতে পেতেন, কেউ নির্মাণ কাজ না করলেও আপনা থেকেই এগিয়ে যাচ্ছে মসজিদের নির্মাণকাজ। তাদের ধারণা হয়, হয়তো জ্বীনই বানাচ্ছে মসজিদটি। যাতায়াতকারীরা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে প্রচার করতে থাকেন এ কথা। তাছাড়া মাওলানা আবদুল্লাহর আধ্যাত্মিকতা আর দ্বীনী জ্ঞানের প্রসিদ্ধির কারণে এ প্রচারণা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

মসজিদের সঙ্গে জ্বীন জাতিকে জড়িয়ে আরো বহু কথা প্রচলিত আছে রায়পুর উপজেলা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলে। এখনো বহু মানুষ নিয়ত-মানত করে নামাজ পড়তে আসেন মসজিদটিতে। উপকারের আশায় মসজিদ সংলগ্ন কূপের পানি নিয়ে যান তারা। তবে এত অল্প সময়ের মধ্যে মসজিদের জন্য দুটি দীঘি কাটা,

ইট তৈরি করা হয়েছিল, যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের অতীত ছিল। সেটাই বা কীভাবে সম্ভব হয়েছে সে ব্যাপারেও প্রশ্ন থেকে যায়।

সংস্কারের অভাবে নষ্ট হতে বসেছিল মসজিদটি। সোর্স: লক্ষ্মীপুর নিউজ মসজিদটির অন্যতম আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে মসজিদের তলদেশে ২০ ফুট নিচে ৩ কামরা বিশিষ্ট গোপন কামরা (আন্ধার মানিক) এবাদতখানা। নির্জন পরিবেশে সেখানে বসে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকতেন মৌলভী আবদুল্লাহ।

এই ঘটনাবহুল ইতিহাসের কারণেই লক্ষ্মীপুরের বাকি দুটো মসজিদ দেখে হতাশ হবার পরেও জ্বীনের মসজিদ দেখতে এসেছি। তখনই আসরের আজান হচ্ছে। গিয়েই মনে হলো খুব ভুল সময়ে এসেছি। মসজিদের সামনে, দীঘির পাড়ে তখন মুসল্লিদের আনাগোনা।

তারা খুব অবাক হয়ে তাকাচ্ছিল আমাদের দিকে। আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। তাই মসজিদের ২-৩ টা ছবি তুলে মসজিদের সামনে থেকে চলে এসেছি। আরমান অবশ্য জ্বীনের মসজিদে নামাজ পড়ার সুযোগটা মিস করেনি। নামাজ পড়ে এসে আমাদের সাথে যোগ দেয় ও। বলল,

‘ভিতরে খুবই সুন্দর। মাটি থেকে প্রায় নয় ফুট উপরে উঠোনমতো একটা জায়গা। তার পরই মসজিদে প্রবেশপথ। ভিতরে কক্ষগুলোর সাথে বাইরের উঠোনের বিচ্ছেদ ঘটিয়েছে থাই গ্লাস দিয়ে তৈরি করা পার্টিশন। তবে এই গ্লাসের দেয়া উপর দিয়েই দেখা যায়। ১৬-১৭ ফুট উপরে ছাদ। ছাদ থেকেও ৩০ ফুট গভীর গম্বুজ।

৬-৭ টা পিলার মসজিদের ভিত। নামাজের জামাআতে পুরো মসজিদ ভর্তি হয়।’ Share মসজিদের সামনের পুকুরের পাড়ের এই জিনিসটি খুব সম্ভবত কুয়া ছিল। সোর্স: লেখিকা। বর্তমানে এ মসজিদটির পরিচর্যার জন্য একজন ইমাম ও খোৎবা ইমাম রয়েছেন।

পবিত্র এই মসজিদটির নান্দনিক রূপায়ন ও অদ্ভুত অবকাঠামো এবং শৈল্পিক অবয়বের দিক থেকে এটি লক্ষ্মীপুর জেলার একটি প্রাচীন নিদর্শন। এই মসজিদে একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন ৫০০ মুসল্লি। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে বহু দর্শনার্থীর আগমন ঘটে মসজিদটি দেখতে।

স্থানীয় মুসল্লিদের অনুদানের টাকায় মূল নকশা ঠিক রেখে বেশ কয়েকবার সংস্কার কাজ করা হয়েছে মসজিদটিতে। রক্ষণাবেক্ষণও চলে

সর্বশেষ নিউজ